১২ বছরেও প্রকল্প শেষ হয়নি ব্যয় বেড়েছে ৩ গুণ

পোস্ট এর সময় : ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ , ভিজিটর : ১১

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের অঙ্গীকার ছিল, দেশে কর্মক্ষম বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (টিএসসি) গড়ে তোলা হবে। সেই উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে নেওয়া হয়েছিল ‘এক উপজেলায় এক টিএসসি’ নামের একটি বৃহৎ প্রকল্প। মাত্র আড়াই বছরে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প শুরু হয়ে বর্তমানে ১২ বছর পেরোলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। অথচ এর মধ্যেই প্রকল্প ব্যয় আড়াই গুণের বেশি বেড়ে গেছে, সময় বাড়ানো হয়েছে ছয়বার।

সর্বশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো দেড় বছর সময় ও অতিরিক্ত এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা চেয়েছে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ। বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, পরিকল্পনায় দুর্বলতা আর ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার ফলেই এই পরিস্থিতিতে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলের বিরুদ্ধেই।

২০১৪ সালে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (টিএসসি) গড়ে তোলা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ১০০টি উপজেলায়

কিন্তু বাস্তবে ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ৩০ শতাংশ কাজ অসম্পূর্ণ। ব্যয় বেড়েছে তিন গুণের বেশি, সময় বাড়ানো হয়েছে ছয়বার, আর প্রকল্পের জাতীয় লক্ষ্য—দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার স্বপ্ন, তা-ও এখনো ঝুলে আছে।

প্রকল্পটির নাম ‘একটি উপজেলায় একটি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (প্রথম পর্যায়)’। বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ (টিএমইডি)।

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯২৪ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য ছিল কারিগরি শিক্ষাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিবছর এক লাখের বেশি দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা।

প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুনের মধ্যেই ১০০টি উপজেলায় টিএসসি প্রতিষ্ঠা, অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসেও কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটির অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশের বেশি নয় বলে নিশ্চিত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০০টির মধ্যে ৭২টি টিএসসির ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬টি প্রতিষ্ঠান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর কাছে শর্তসাপেক্ষে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগেই শিক্ষা কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়নি। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য উপকেন্দ্র স্থাপনে দেরি, ট্রেডভিত্তিক যন্ত্রপাতি সরবরাহে বিলম্ব এবং টেন্ডার জটিলতা।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা প্রকৌশল ব্যর্থতার চেয়েও বেশি প্রশাসনিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। একাধিকবার ডিপিপি সংশোধনের আবেদন, প্রকৌশল মানদণ্ডে ঘাটতি ও অর্থনৈতিক কোড পরিবর্তনের কারণে বাজেটও বারবার পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে।

বর্তমানে প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫২৫ কোটি টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২.৭৩ গুণ বেশি। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নির্মাণ ব্যয় ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে গেছে। এ ছাড়া নতুন অর্থনৈতিক কোড চালু হওয়ায় প্রশাসনিক ব্যয়েও পরিবর্তন এসেছে।

কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ (টিএমইডি) প্রকল্পটির মেয়াদ আরো ১৮ মাস বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে এই প্রস্তাব এখন যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখনো আশাবাদী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা গড়পড়তা উচ্চ আয় করে থাকেন। ফলে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের তরুণদের কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে দক্ষ শ্রমিক রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *