‘তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে, হৃদয়ের কোঠরে রাখবো/ আর হৃদয়ের চোখ মেলে তাঁকিয়ে, সারাটি জীবন ভরে দেখবো’ গানটি গেয়েছিলেন লক্ষ্য কোটি তরুণ-তরুণীর প্রিয় কন্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। যিনি আধুনিক, ক্লাসিক্যাল ও লোকগীতিসহ সব ধরনের গানের এক উজ্জ্বল তারকা। আজ এই তারকার জন্মদিন।
শুক্রবার দিবাগত রাত থেকেই ভক্ত অনুরাগীদের শুভেচ্ছা ও ভালবাসায় ভাসছেন তিনি।
গতকাল রাতে নিজের জমানো টাকা দিয়ে বাবার জন্য কেক কেটে জন্মদিন পালন করেছেন কুমার বিশ্বজিতের একমাত্র ছেলে কুমার নিবিড়। বাবার প্রতি ছেলের এই ভালোবাসায় সিক্ত কুমার বিশ্বজিৎ।
তিনি বলেন, আমার ছেলে টাকা জমিয়ে আমার জন্য কেক কিনেছে। কেক কেটে আমাকে খাইয়ে দিয়েছে। এর থেকে ভালোবাসা আর কি হতে পারে। ওর মাত্র ১৭ বছর বয়স। সেরা উপহারটা ছেলের কাছ থেকে পেয়েছি।
নিজের জন্মদিনে এখন আর তেমন কোন পরিকল্পনা নেই। মা, ছেলে আর পরিবারের সাথেই দিনটি কেটে যাবে। সবাই বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তাদের ভালোবাসায় আমি সিক্ত। তাদের সবার প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা ও আশীর্বাদ রইলো। এমনটাই জানান কুমার বিশ্বজিৎ।
তিনি আরও বলেন, জন্মদিন আসলে মনে হয় আরও একটি বছর এগিয়ে গেলাম প্রায় যেন দেয়ালের কাছাকাছি। সবার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা যেটা পাচ্ছি এই সম্মানটা নিয়ে যেন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারি এটাই চাওয়া। আর কিছুই চাওয়ার নেই।
‘আমি আমার জন্মদিনে মা-বাবার কাছে ঘটা করে কিছুই চাইতাম না কখনও। আমি তো ছাত্র বয়সেই গান শুরু করি ১৯৭৭ সাল থেকে,তখন সবার মত করে যে কাপড়-চোপড় উপহার নেওয়া ঐটা আমার মধ্যে ছিল না। তবে হ্যা, আমাকে উপহার দেওয়ার কথা বললে আমি সবসময় আমার মাকে বলতাম আমাকে কোন একটা মিউজিক ইন্সট্রমেন্ট কিনে দাও। কখনও গিটার চাওয়া বা ড্রামস সেট চাওয়া। তখন সেটা কিনে দেয়া পরিবারের জন্য একটু সমস্যা হলেও মা সেটা কিনে দিতেন। আমার খুব মজা লাগে যখন আমাই আমার মাকে জিজ্ঞেস করি মা, আমার জন্মদিন কবে? তখন মা বলতো ঐদিন মনে হয় সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল আর শনিবার ছিল। তখনকার মানুষজন কত সহজ সরল ছিল সেটা ভাবলে খুব আশ্চর্য লাগে। অথচ আজকেও কিন্তু শনিবার এবং আজকেও বৃষ্টি হয়েছে। কিভাবে যেন মিলে গেল ব্যাপারটা। আজকে সকালে মাকে সালাম করে দোয়া নিলাম। আমারে মা শিক্ষিকা ছিলেন যার কারণে ছোটবেলা থেকে খুব শাসনে বড় হয়েছি। বাবা সীতাকুন্ড থেকে দূরে চাকুরী করতেন তাই সপ্তাহে একদিন বাড়ি আসতেন। আর বাবা আসবে শুনলেই মনে ভীতি কাজ করতো। আমরা তো একান্নবর্তী পরিবার ছিলাম সবার ভালোবাসা ও আদরটা পেতাম আমি। কিন্তু এখন সেটা খুব মিস করি।’
তখন ছিল চাওয়া পাওয়ার সময় কিন্তু এখন তো আর সেটা নেই। এখন হচ্ছে পূরণ করার সময়। সেরা উপহার যদি বলি সেটা আমার শ্রোতা দর্শকদের ভালোবাসা। তাদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়ে এসেছি এবং এখনও পাচ্ছি এটাই আমার কাছে অনেক। যে ভালোবাসা পাচ্ছি সেই ভালোবাসা ও তাদের সেই সম্মানটা নিয়েই যেন বিদায় নিতে পারি এটাই একমাত্র চাওয়া।
১৯৭৭ সাল থেকে গানের শুরু হলেও ১৯৮২ সালে ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গান দিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল এই সঙ্গীতজ্ঞের। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। সেই সময়ে এই গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আজও লোকমুখে গানটি সমাদৃত। এরপর তুমি রোজ বিকেলে, যেখানে সীমান্ত তোমার, তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে ফুল নিতে আসতে, ভিটা নাই রে, আমি সাম্পানে বাঁধিব ঘর, মানুষ বুড়ো হয় মন বুড়ো হয় না, মাতাল হাওয়া কেন বুকের মাঝে মিশে, সেই কথা সেই স্মৃতি এর মতো গান দিয়ে এখনও শ্রোতাদের হৃদয়ে চির সবুজ হয়ে আছেন কুমার বিশ্বজিৎ। এখনও সমান তালেই গেয়ে চলেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ১৯৬৩ সালের ১ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ। তার শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামেই। ‘তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে’ গান দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রাবস্থাতেই তিনি পেয়েছিলেন জনপ্রিয় গায়কের খ্যাতি। বাংলা আধুনিক কিংবা চলচ্চিত্রের গানে দীর্ঘ চার দশক ধরে কণ্ঠ দিচ্ছেন কুমার বিশ্বজিৎ। তিন বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় করেছেন।

