আসিয়ান জোটের ১০টির মধ্যে আটটি দেশই পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের মুখে, যা আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক : বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। এ কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’ না জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের কারণে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো বর্তমানে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেই বুধবার আসিয়ান জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই সতর্কতার আহ্বান জানান।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের আঞ্চলিক জোট হচ্ছে আসিয়ান। বিশ্বের সবচেয়ে বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর বেশ কয়েকটি এই জোটের সদস্য বলে মনে করা হয়। তবে জোটের ১০টির মধ্যে আটটি দেশই পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের মুখে, যা আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে নীতিকে অস্থির করে তুলছে ক্ষমতা। একসময় যে বিষয়গুলো প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হতো, এখন তা চাপ সৃষ্টি, একঘরে করা ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও চলমান বাণিজ্য হুমকি মোকাবেলায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জোটভুক্ত দেশগুলোকে পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়ানো, আঞ্চলিক সংহতি জোরদার এবং বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সংহতি কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমিত থাকলে চলবে না। এই বাণিজ্য হুমকি কোনো ক্ষণস্থায়ী ঝড় নয়। এটি আমাদের সময়ের নতুন বাস্তবতা।’
চলতি বছরের এপ্রিলে প্রথম এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। অবশ্য সমঝোতার সুযোগ দিতে সে সময় ৯০ দিনের জন্য শুল্ক স্থগিত করা হয়। চলতি সপ্তাহে সোমবার ও বুধবার নতুন করে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে, আবার কোনো দেশের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। কোনো সমঝোতায় না এলে ১ আগস্ট থেকে এই হারে শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। একইসাথে কোনো দেশ পাল্টা পদক্ষেপ নিলে তার বিরুদ্ধে আরো শুল্ক বাড়ানোর হুমকিও দেন তিনি।
প্রথমবারে শুল্ক আরোপের পর কেবল ভিয়েতনামই একটি চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হার ৪৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামাতে পেরেছে।
আসিয়ানভুক্ত অনেক দেশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে আসিয়ান-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে তারা যৌথ অবস্থান তৈরির চেষ্টা করবে।
এদিকে, মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জাফরুল আজিজ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুল্ক নিয়ে আলোচনা চলবে, তবে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয়ে তারা আপস করবেন না।
বাণিজ্য সংকট ছাড়াও আসিয়ান জোট এখন আরো কিছু গুরুতর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ এবং থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধ অন্যতম।
মালয়েশিয়ায় চলমান এই সম্মেলন শেষে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার আসিয়ান জোটের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে অংশ নেবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বৃহস্পতিবার সম্মেলনে যোগ দিতে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এটাই এশিয়ায় তার প্রথম সফর। বৈঠকে আরো অংশ নিচ্ছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
এই অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার কারণে এই বৈঠকগুলোতে আসিয়ান জোটের ভূমিকা বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি, অন্যায্য কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলা মেনে চলার অঙ্গীকার জোরদার করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছে এই জোটটি।

