এই না হলে পাকিস্তান! ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ তকমা তো আর নামের পাশে এমনি এমনি জুড়ে বসেনি। এই দলটি কখন কি করবে, আগে থেকেই বলা মুশকিল। যেমনটা বলা গেল না টনটনে আজকের (বুধবার) ম্যাচটির শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচটিই উপহার দিল টনটন। যে নাটকের পুরো চিত্রনাট্যই ঘুরপাক খেলো পাকিস্তানের হাত ধরে। ম্যাচে উত্থান-পতন আর টানটান উত্তেজনা, সব কিছুই ঘটলো আসলে পাকিস্তানের আনপ্রেডিক্টেবল চরিত্রের কারণে।
পাকিস্তানের বোলিংয়ের সময় মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা দুমড়ে মুচড়ে দেবেন আজ। সেখান থেকে এক ওভার বাকি থাকতেই অজিদের অলআউট করে দেয় সরফরাজের দল। পরে রান তাড়ায়ও একটা সময় মনে হলো, সহজেই জেতার পথে হাঁটতে যাচ্ছে পাকিস্তান। কিন্তু মনে হলে তো হবে না, দলটা যে পাকিস্তান! কখন কি করবে বলা মুশকিল।
নাটকীয়তায় ঠাসা ম্যাচটি শেষও হলো নাটকীয়ভাবে। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ননস্ট্রাইক এন্ডে সরফরাজ আহমেদ যেভাবে রানআউট হলেন, সেটাও আসলে মনে রাখার মতো। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি জিতেছে ৪১ রানে।
লক্ষ্য ৩০৮ রানের। ৫৬ রানের মধ্যে ২ উইকেট হারানোর পর তৃতীয় উইকেটে ৮০ রানের জুটি গড়েছিলেন মোহাম্মদ হাফিজ আর ইমাম উল হক। একটা সময় পাকিস্তানের রান ছিল ২ উইকেটে ১৩৬। মোটে তখন ২৫ ওভার খেলা হয়েছে। সেখান থেকে আর ২৬ রান তুলতে ৪টি উইকেট হারিয়ে বসে আনপ্রেডিক্টেবলরা। ইমাম আউট হন ৫৩ রানে, হাফিজ করেন ৪৬।
দারুণভাবে রান তাড়ায় এগিয়ে চলা পাকিস্তানেরই পরে স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ১৬০ রান। ছোটখাট এক ঝড় তুলে (১৫ বলে ৩২) সাজঘরের যাত্রী হাসান আলিও। ২০০ রানে তখন ৭ উইকেট নেই পাকিস্তানের।
জিততে হলে তখনও দরকার আরও ১০৮ রান। সেখান থেকে অষ্টম উইকেটে ৬৩ বলে ৬৪ রানের অবিশ্বাস্য এক জুটি গড়ে ম্যাচ অনেকটাই হাতের কাছে নিয়ে আসেন সরফরাজ আর ওয়াহাব রিয়াজ। মনে হচ্ছিল, পাকিস্তানই জিতে যাবে শেষ পর্যন্ত।
কিন্তু নাটকীয়তার তখনও অনেক বাকি। ৪৫তম ওভারে এসে ওয়াহাব-সরফরাজের জুটিটি ভেঙে দেন মিচেল স্টার্ক। তার দুর্দান্ত এক ডেলিভারি উইকেটরক্ষকের হাতে গেলে আবেদন করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়রা, কিন্তু আম্পায়ার তাতে সাড়া দেননি। পরে রিভিউ নিয়ে জিতে যায় অস্ট্রেলিয়া। দেখা যায় বল লেগেছে ওয়াহাবের ব্যাটে।
৩৯ বলে ২ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ৪৫ রান করা ওয়াহাব ফেরার পর আবারও ম্যাচ ঝুঁকে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার দিকে। ওই ওভারেই মোহাম্মদ আমিরকে শূন্য রানে বোল্ড করে জয়টা নিজেদের আরও কাছে নিয়ে আসেন স্টার্ক। পাকিস্তানের তখন ৩২ বলে দরকার ৪৩ রান। হাতে মাত্র ১ উইকেট।
সেই শেষ উইকেটটিও পড়লো নাটকীয়ভাবে। রিচার্ডসনের বলটি শর্ট এক্সট্রা কাভারে খেলেছিলেন শাহীন শাহ আফ্রিদি। ননস্ট্রাইক এন্ড থেকে সরফরাজ রানের জন্য দৌড়ও দেননি। একটু বেরিয়েছিলেন। চোখের পলকে স্ট্যাম্প ভেঙে দেন ম্যাক্সওয়েল। পাকিস্তান অধিনায়ক আউট হন ৪০ রানে।
এর আগে পাহাড়সমান সংগ্রহের পথে এগুতে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দেন পাকিস্তানি বোলাররা। ডেভিড ওয়ার্নারের সেঞ্চুরির পরও অস্ট্রেলিয়া এক ওভার বাকি থাকতে অলআউট হয় ৩০৭ রানে।
৪২ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার রান ছিল ৪ উইকেটে ২৭৭। হাতে ৮ ওভার আর ৬টি উইকেট। সাড়ে তিনশ করা কঠিন ছিল না। কিন্তু পরের সাত ওভারে ওই ৬টি উইকেট হারিয়ে মাত্র ৩০ রান তুলতে পারে অ্যারন ফিঞ্চের দল। এই ৬ উইকেটের ৪টিই নিয়েছেন পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমির।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরু থেকেই মারমুখী ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা। দুই ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার আর অ্যারন ফিঞ্চ উইকেটের চারদিকে শটের পসরা সাজিয়েছেন। ওপেনিং জুটিতেই তারা তুলে ফেলেন ১৪৬ রান।
২৩তম ওভারে এসে থিতু হওয়া এই জুটিটি ভাঙেন মোহাম্মদ আমির। সেঞ্চুরির বেশ কাছে চলে যাওয়া ফিঞ্চকে মোহাম্মদ হাফিজের ক্যাচ বানান বাঁহাতি এই পেসার। ৮৪ বলে ৬ বাউন্ডারি আর ৪ ছক্কায় অসি ওপেনার তখন ৮২ রানে।
ফিঞ্চের আউটে উইকেটে আসা স্টিভেন স্মিথ অবশ্য খুব বেশিদূর এগোতে পারেননি। ১০ রান করে হাফিজের শিকার হন সাবেক অসি অধিনায়ক। এরপর ঝড় তুলতে চেয়েছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ১০ বলেই ২০ রান করে ফেলা এই ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করেন শাহীন শাহ আফ্রিদি।
তবে একটা প্রান্ত আগলে রেখে ঠিকই দলকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। ১০২ বলেই তুলে ফেলেন সেঞ্চুরি, শেষ পর্যন্ত মারকুটে এই ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফেরত পাঠান শাহীন আফ্রিদি।
পাকিস্তানি পেসারকে তুলে মারতে চেয়েছিলেন ওয়ার্নার। আকাশে ভাসা বল তালুবন্দী করেন ইমাম উল হক। ১১১ বলে ১১ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায় গড়া অসি ওপেনারের ১০৭ রানের ইনিংসটি থামে তাতেই।
৪২তম ওভারের প্রথম বলে ১৮ রান করে আমিরের শিকার হন উসমান খাজা। অস্ট্রেলিয়ার ধস সেই শুরু। এরপর একে একে উইকেট তুলে নিয়েছেন পাকিস্তানি পেসাররা। রানও রেখেছিলেন আটকে। সবমিলিয়ে ১ ওভার বাকি থাকতে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থামে ৩০৭ রানে।
১০ ওভারে ২ মেডেনসহ ৩০ রান খরচায় ৫টি উইকেট নিয়েছেন মোহাম্মদ আমির। ২টি উইকেট শিকার শাহীন শাহ আফ্রিদির।

