দেবব্রত পাল বাপ্পী
আজ ১১ ডিসেম্বর কুমিল্লার লাকসাম হানাদার মুক্ত দিবস। বাঙালী জাতির গৌরবোজ্জল মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মাসের শুরু। ১৯৭১ সালের এ ডিসেম্বর বাঙালী জাতির জীবনে নিয়ে এসেছিল এক মহান অর্জনের আনন্দ। ৭১’র এ মাসেই পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত হয় এ অঞ্চল। পাক লোকজনের সু-দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষন-বঞ্চনা আর অত্যাচার-নির্যাতনের কবর হয় বিজয়ের এ মাসেই। পাকবাহিনীর কবল থেকে স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধারা এ দিনে লাকসাম হাইস্কুল মাঠে তৎকালীন ছাত্রনেতা মরহুম নজির আহমেদ ভুঁইয়া প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলকে শত্রæমুক্ত করেন। দিবসটি পালন উপলক্ষে জেলা দক্ষিনাঞ্চলের বৃহত্তর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন সরকারী- বেসরকারী সংগঠন দিনব্যাপী নানাহ কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। আগামী দিনে তরুন প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিক ভাবে অবহিত হতে পারে এবং স্বাধীনতা বিরোধী চক্র কোনদিন ইতিহাস বিকৃতি করতে না পারে সে জন্য প্রতিটি জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপনের কোন বিকল্প নেই। তাহলেই শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা-শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার-আলবদরদের চূড়ান্ত তালিকা সংরক্ষন করা সম্ভব বলে দাবী স্থানীয় একাধিক মুিক্তযোদ্ধাদের।
জানা যায়, এ অঞ্চলের বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকা শহরে পাক হানাদার বাহিনী বাঙ্গালী নিধন শুরু করলে সেই দিন থেকে বৃহত্তর লাকসামের মুক্তি পাগল সকল পেশার মানুষ পাক সেনাদের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের বিভিন্নস্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সু-সংগঠিত করা এবং সুষ্ঠভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বৃহত্তর লাকসামকে ৪টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ৪টি সেক্টরের যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসাবে মো. আবু তাহের মজুমদার, মো. ছায়েদুল ইসলাম, আবুল বাশার ও মো. আবদুল মালেক দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি এ অঞ্চলের চারিদিকের সীমানা নিয়ে গঠিত ৪টি সেক্টর কমান্ডের সাথে একাধিক প্লাটুন মানুষ গেরিলা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। লাকসামের উত্তরে বিজয়পুর (বর্তমান সদর দক্ষিণ ও নবগঠিত লালমাই উপজেলা), পশ্চিমে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলা, দক্ষিণে নোয়াখালী জেলার বর্তমানে সোনামুড়ি উপজেলা এবং পূর্বে বর্তমান চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ভারত সীমান্ত ছিল এ অঞ্চলের যুদ্ধকালীন এলাকা। যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন বিগ্রেডে ৪’শ ৭২ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরে শুধু দীর্ঘ হচ্ছে স্বঘোষিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। ১৯৭১ সালের এ মাসেই শুরু হয় পাক সেনাদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করলেই পাল্টা প্রতিরোধে ঝাপিয়ে পড়ে এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় আম-জনতা। দীর্ঘ ৯ মাস যূদ্ধ শেষে কয়েক হাজার মানুষের রক্ত এবং কয়েক’শ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে এ মাসেই পান বিজয়ের স্বাদ।
অপর একটি সূত্র জানায়, লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দক্ষিণে থ্রী-এ সিগারেট ফ্যাক্টরী ও পশ্চিমগাঁও শহীদ মিয়ার বাড়ী এ অঞ্চলের পাকহানাদার বাহিনীর মূল ঘাঁটি ছিল। এ অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা, অস্ত্র এবং যুদ্ধের যাবতীয় উপকরণ সরবরাহ করা হতো এখান থেকেই। এ ঘাঁটিতে বিভিন্ন স্থান হতে বাঙ্গালী নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতীতের ধরে পাশবিক নির্যাতন শেষে হত্যা করে রেলওয়ে জংশনের দক্ষিণ পাশেই রেল-লাইনের পূর্ব দিকে বেলতলী নামক স্থানে গণকবর করে মৃত লোকজনকে মাটি চাপা দেয়া হতো। বর্তমানে এ স্থানটি লাকসাম বেলতলী বধ্যভূমি নামে পরিচিত। বৃহত্তর লাকসামে মুক্তিসেনাদের সাথে সকল পেশার মানুষ অংশ নিয়ে প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে ৮ ডিসেম্বর থেকে পাক-সেনারা পিছনে হটতে থাকে অবশেষে ১১ ডিসেম্বর আজকের এ দিনে বৃহত্তর লাকসাম অঞ্চলটি পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়।

